‘
শাহিন আলম আশিক
বিশেষ প্রতিনিধি, অপরাধ জগত।
৫ আগস্টের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর যখন পুলিশ বাহিনীর চেইন অব কমান্ড সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছিল, তখন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন রেজাউল করিম মল্লিক। তাঁর স্বল্পকালীন মেয়াদে তিনি যে সাহসিকতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল।
কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠেছে—আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, ডিবির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার আর রাঘববোয়ালদের অপরাধের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দেওয়াটাই কি তবে তাঁর জন্য অপরাধ হয়ে দাঁড়াল? যার খেসারত হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার এক মাস পরও তাঁকে কোনো ইউনিটে পদায়ন না করে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছে?
গত ৪ জুন ডিআইজি থেকে অতিরিক্ত আইজিপি পদে পদোন্নতি পান ১৭তম বিসিএস-এর এই চৌকস কর্মকর্তা। একই দিনে পদোন্নতি পাওয়া অন্য চার কর্মকর্তা দ্রুতই বিভিন্ন ইউনিটে দায়িত্ব পেলেও, ঢাকা রেঞ্জের দায়িত্বে থাকা এই বীর কর্মকর্তার ফাইলটি রহস্যজনকভাবে আটকে রাখা হয়েছে। চলতি মাসেই তাঁর অবসরে যাওয়ার কথা, আর ঠিক এই বিদায়লগ্নে এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের এই নীরব আচরণ পুলিশ প্রশাসনের ভেতরে এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
বঞ্চনার নেপথ্যে: ‘হানি ট্র্যাপ’ ও রাঘববোয়ালদের দুর্গ ভাঙার খেসারত?
রেজাউল করিম মল্লিকের অপরাধ ছিল—তিনি আপসহীন ছিলেন এবং আইনের চোখে সবাই সমান, এই নীতিতে বিশ্বাস করতেন। ডিবির দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর কিছু যুগান্তকারী পদক্ষেপ স্বার্থান্বেষী মহলের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল:
রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক ক্র্যাকডাউন: ফ্যাসিবাদ পতনের পর দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও সাহসী অভিযানগুলোর নেতৃত্ব দেন তিনি। ক্ষমতার অপব্যবহারকারী সাবেক প্রভাবশালী মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক রাঘববোয়ালদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযান চালিয়ে প্রায় তিন শতাধিক রাঘববোয়ালকে আইনের মুখোমুখি করেন। নেপথ্যে থাকা গডফাদারদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই প্রভাবশালী চক্রকে গ্রেপ্তারের কারণেই তিনি মূলত একটি গভীর ষড়যন্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন।
হানি ট্র্যাপ সিন্ডিকেট নির্মূল: সমাজের তথাকথিত উচ্চবিত্ত, প্রভাবশালী এবং রাঘববোয়ালদের ব্ল্যাকমেইল করে আসা ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের সুন্দরী হোতাদের কোনো রকম তদবির তোয়াক্কা না করে আইনের আওতায় আনেন তিনি। এই সাহসী অভিযানের মাধ্যমে তিনি অপরাধের এক অন্ধকার অধ্যায় উন্মোচন করেছিলেন।
‘ভাতের হোটেল’ সংস্কৃতির অবসান: ডিবির গায়ে লেগে থাকা কলঙ্কিত ও সস্তা ‘ভাতের হোটেল’ সংস্কৃতি চিরতরে বিদায় করে তিনি সংস্থাটিকে একটি আধুনিক, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক মানের গোয়েন্দা ইউনিটে রূপান্তর করেন। ভেঙে পড়া পুলিশের হারানো ইমেজ পুনরুদ্ধারে তাঁর এই ভূমিকা ছিল অনন্য।
বঞ্চনার দীর্ঘ ইতিহাস ও চলমান প্রোপাগান্ডা
রেজাউল করিম মল্লিকের জন্য এই বঞ্চনা অবশ্য নতুন কিছু নয়। বিগত ফ্যাসিবাদের আমলে রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়ে তাঁকে দীর্ঘদিন পদোন্নতি বঞ্চিত রাখা হয়েছিল। এমনকি মিথ্যা অভিযোগে চাকরিচ্যুত করার পরও তিনি ভেঙে পড়েননি; দীর্ঘ ৪ বছরের আইনি লড়াইয়ে সগৌরবে জয়ী হয়ে পুলিশ বাহিনীতে ফিরে এসেছিলেন।
অথচ আজ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে রেজাউল করিম মল্লিক ও তাঁর পরিবারকে চরম মূল্য চোকাতে হচ্ছে। নিষিদ্ধ সংগঠন ও রাজনৈতিক মহলের ক্রমাগত হুমকি এবং চরম security শঙ্কার কারণে তাঁর দুটি সন্তানের শিক্ষা জীবন পর্যন্ত আজ ব্যাহত। এর ওপর, আসন্ন পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে তাঁর পদায়ন ঠেকাতেই একটি কুচক্রী মহল সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে নোংরা ও ভিত্তিহীন প্রোপাগান্ডায় কোমর বেঁধে নেমেছে। মাঠ পর্যায়ে যখন তাঁর মতো দক্ষ অফিসারের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ঠিক তখনই এক অদৃশ্য চালে তাঁকে ডিবি প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
সারকথা: রাষ্ট্র সংস্কারের মুখে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন
দেশ যখন বৈষম্যহীন সমাজ গঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন রেজাউল করিম মল্লিকের মতো একজন পরীক্ষিত, দক্ষ এবং সৎ কর্মকর্তাকে আমলাতান্ত্রিক গোলকধাঁধায় ফেলে পদায়নহীন রাখা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিদায়ের প্রাক্কালে একজন বীর অফিসারকে প্রাপ্য সম্মান ও দায়িত্ব থেকে বঞ্চিত করা প্রকারান্তরে মেধার টুঁটি চেপে ধরা এবং অপরাধী সিন্ডিকেটের কাছে আত্মসমর্পণ করারই শামিল।
রেজাউল করিম মল্লিক কোনো ব্যক্তি নন, তিনি ভেঙে পড়া পুলিশ বাহিনীর আত্মমর্যাদা ফিরিয়ে আনার এক অনন্য প্রতীক। রাষ্ট্র সংস্কারের এই সন্ধিক্ষণে এমন যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। চক্রান্তের মেঘ কেটে সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী।