বিশেষ প্রতিনিধি :
ঢাকার মোহাম্মদপুরে ভূখণ্ড ও ভবনের মালিকানা ঘিরে এক অভূতপূর্ব, ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর চিত্র উন্মোচিত হয়েছে।
এই জালিয়াতি ও জবরদখলের নেপথ্যে রয়েছে একটি ভয়ংকর সিন্ডিকেট, যার মূল হোতা ভূমিদস্যু মো. রেজাউল করিম এবং ভুয়া দলিল ও নামজারির প্রধান কারিগর মো. গিয়াস উদ্দিন ভুইয়া। কেবল নথিপত্রের অসংগতি নয়, বরং সরকারি দপ্তর ও এই প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে মোহাম্মদপুরের পুলপাড় জাফরাবাদ এলাকায় রচিত হয়েছে পরিকল্পিত অপরাধের এক নৃশংস নজির। একই দলিল নম্বর ও তারিখ ব্যবহার করে দ্বৈত মালিকানা দাবি এবং এর জেরে সশস্ত্র হামলা, লুটপাট ও প্রাণঘাতী মারধরের মতো লোমহর্ষক ঘটনা প্রমাণ করে—সরকারি নথিপত্রকে হাতের মোয়া বানিয়ে চলছে গিয়াস-রেজাউল চক্রের দখলদারিত্বের মহোৎসব।
গিয়াস-রেজাউলের ‘জাদুকরী’ দলিল
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০০৮ সালের ৫ মার্চ সম্পাদিত ১৪৩৩ নং দলিলটি রহস্যময়ভাবে দুটি ভিন্ন রূপ ধারণ করেছে। একদিকে আদালতে বিচারাধীন একটি মামলায় এটি কুতুবউদ্দিনের নামে ‘হেবা’ দলিল হিসেবে প্রদর্শিত। অন্যদিকে, একই নম্বর ও তারিখ ব্যবহার করে মো. গিয়াস উদ্দিন ভুইয়া ও মো. রেজাউল করিম দাবি করছেন এটি তাদের ক্রয়কৃত ‘সাব-কবলা’ দলিল। একটি দলিলে দুই রূপ ধারণ করার এই ঘটনা নিছক কোনো ভুল নয়, বরং এটি বালাম বই টেম্পারিং ও নথিপত্র জালিয়াতির এক সুপরিকল্পিত মডেল।
আমাদের অনুসন্ধানী কথোপকথনেও এই দ্বৈত সত্তার বিষয়টি উঠে এসেছে, যা ঢাকার ভূমির মালিকানা নিয়ে গিয়াস-রেজাউল সিন্ডিকেটের এক গভীর ষড়যন্ত্রকেই নির্দেশ করে।
সাব-রেজিস্ট্রি ও এসি (ল্যান্ড) অফিসে সিন্ডিকেটের কালো হাত
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে নামজারি প্রক্রিয়ার সময়কাল ও অস্বচ্ছতা নিয়ে। মূল দলিলটি যদি ২০০৮ সালের হয়, তবে দীর্ঘ ১৮ বছর পর হঠাৎ ২০২৫ সালে এসে কেন নামজারি করা হলো? এই দীর্ঘ সময় ধরে তারা কোথায় ছিল? ভুক্তভোগী যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মো. জোবায়ের হোসেন গত দেড় দশক ধরে ওই জমিতে ৮ তলা ভবন নির্মাণ করে আইনগতভাবে ভোগদখলে আছেন। অথচ তাকে কোনো নোটিশ না দিয়েই জাদুকরী গতিতে গিয়াস-রেজাউল চক্রের নামে নামজারি সম্পন্ন হলো কীভাবে?
ভূমি আইনের সুস্পষ্ট নিয়ম অনুযায়ী নোটিশ সার্ভ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও, এ ক্ষেত্রে তা রহস্যজনকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ও এসি (ল্যান্ড) অফিসের অসাধু কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছাড়া প্রকৃত মালিককে অন্ধকারে রেখে নামজারি সম্পন্ন করা এবং বালাম বইয়ে এমন জালিয়াতি জিইয়ে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
জালিয়াতি থেকে সশস্ত্র হামলা ও হাসপাতাল রেকর্ড
কাগজপত্র ও বালাম বইয়ের জালিয়াতির পর পেশিশক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জবরদখলের ভয়ানক রূপ দেখিয়েছে গিয়াস-রেজাউল চক্র।
গত ১ জুলাই ২০২৬ তারিখে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলায় জালিয়াতি চক্রের আসল চেহারা উন্মোচিত হয়। ভুক্তভোগী মো. জোবায়ের হোসেনের পক্ষে মোহাম্মদপুর থানায় দায়েরকৃত এজাহার *(মামলা নং-১১, তারিখ: ০২/০৭/২০২৬)* সূত্রে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। জামিনে বের হয়ে আসামিরা আবারও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
লুটপাট, জবরদখল ও কিশোর গ্যাং দিয়ে পুনরায় হামলা:
হামলাকারীরা সিসি ক্যামেরা ভাঙচুর করে আনুমানিক ৫ লক্ষ টাকার ক্ষতি সাধন করে। আলমারি ভেঙে নগদ ৫ লক্ষ টাকা, ৪টি বাড়ির মূল দলিলপত্র, ৮টি ফ্ল্যাট ও এরপর তারা ভবনের খালি থাকা একটি ফ্ল্যাট জোরপূর্বক দখল করে নেয়।
এ খবর পেয়ে প্রশাসনের সর্বমহলকে অবহিত করে আজ মঙ্গলবার মূল বাড়ির মালিক তার ভোগদখলকৃত বাড়িতে যাওয়ার পর পরই ভুয়া প্রতারক দখলকারীদের একদল কিশোর গ্যাং দেশীয় অস্ত্র নিয়ে পুনরায় হামলা চালায়। এক পর্যায়ে দ্রুত মোহাম্মদপুর থানার বছিলা পুলিশ ফাঁড়ির টিম এসে হামলাকারীদের কঠোরভাবে দমন করে এবং উপস্থিত সাংবাদিকদের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়।
সংবাদ সম্মেলন ও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা:
ঘটনার পর বাড়ির মালিকের পক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও প্রশাসনের সর্বাত্মক সাহায্য কামনা করে ভুক্তভোগী বলেন,
> “আমি অনতিবিলম্বে আমার ভোগদখলকৃত বাড়িটি এই পেশাদার দখলদার ও ভূয়া দলিল চক্রের হাত থেকে রক্ষা করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন প্রশাসনের সদয় ও কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
ব্ল্যাকমেইলের নীল নকশা
যদি ১৪৩৩ নং সাব-কবলা দলিলটিই আসল হতো, তবে জোবায়ের হোসেনের ৮ তলা ভবন নির্মাণের সময় গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিম কোথায় ছিলেন? কেন তারা দীর্ঘ নির্মাণকাজ চলাকালীন একবারের জন্যও বাধা দেননি? ভবন নির্মাণের এত বছর পর হঠাৎ করে এই ভুয়া দলিল প্রদর্শন, এসি (ল্যান্ড) অফিসের যোগসাজশে নামজারি এবং সশস্ত্র হামলা চালিয়ে ভবন দখলের এই ঘটনা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভুল নয়; এটি এই সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত ব্ল্যাকমেইল ও দখলবাজির চূড়ান্ত নীল নকশা।
ভূমি মালিকানা বা জালিয়াতি কোনো অপরাধীর সম্পত্তি হরণের হাতিয়ার হতে পারে না। গিয়াস উদ্দিন ও রেজাউল করিম সিন্ডিকেট জাল দলিল তৈরি করে রক্তক্ষয়ী হামলা ও দখলের যে রাজত্ব কায়েম করেছে, তা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। অবিলম্বে এই চক্রের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও সুশীল সমাজ।