রিপোর্ট, শামীম আহমেদ :
কিশোরগঞ্জের ভৈরব ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ নৌপথে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর ডাকাতি মামলার অন্যতম প্রধান আসামি ও চিহ্নিত দুর্ধর্ষ নৌ ডাকাত দ্বীন ইসলাম সরকার ওরফে দীরা (৫০) কে গ্রেফতার করেছে ভৈরব নৌ-পুলিশ ফাঁড়ি। শনিবার (২৩ মে ২০২৬) রাত সাড়ে ৮টার দিকে আশুগঞ্জ থানা এলাকার চরচারতলা পূর্বপাড়া গ্রাম থেকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
গ্রেফতারকৃত দীরা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার চরচারতলা পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত মোগল সরকারের ছেলে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় ডাকাতি, ছিনতাই ও নদীপথে সংঘবদ্ধ অপরাধের অন্তত ৪৩টি মামলা রয়েছে।
ভৈরব নৌ ফাঁড়ির ইনচার্জ এ কে এম মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে সঙ্গীয় ফোর্স অভিযান পরিচালনা করে তাকে গ্রেফতার করে। পুলিশ জানিয়েছে, গত ১৪ মে সংঘটিত মেঘনা নদীর আলোচিত ডাকাতি মামলার মূলহোতা হিসেবে দীরার সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
যেভাবে সংঘটিত হয় ডাকাতি
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ভৈরব পৌর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ভৈরব পৌর বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক বিশিষ্ট বাদাম ব্যবসায়ী শামীম আহমেদ, তার দুই ভাই মাসুম আহমেদ ও ফরহাদ আহমেদ যৌথভাবে এম.এম অটো বাদাম মিল, এম.এম বাদাম মিল ও এম.এম ব্রাদার্স অটো চিড়া মিল পরিচালনা করেন।
গত ১৪ মে পূবালী ব্যাংক ভৈরব বাজার শাখা থেকে ব্যবসায়িক কাজে ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা বাদাম ক্রয়ের উদ্দেশ্যে নৌকাযোগে নবীনগরের বাইশমৌজা বাজারে নেওয়া হচ্ছিল।
১৬ মে ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ভৈরব বাজার নৌঘাট থেকে একটি কাঠের নৌকায় করে ব্যবসায়ী শামীম আহমেদ, তার দুই ভাই এবং ১৫ জন কর্মচারী রওনা হন। সকাল আনুমানিক ৬টা ১৫ মিনিটে আশুগঞ্জ থানাধীন চরচারতলা ও লালপুর বাজারের মাঝামাঝি মেঘনা নদীর কাঁঠবাগান এলাকায় পৌঁছালে একটি ইঞ্জিনচালিত ছোট কুশা নৌকায় করে ৬-৭ জন অস্ত্রধারী ডাকাত তাদের নৌকায় উঠে পড়ে।
ডাকাতদের সবার হাতে ধারালো রামদা ছিল এবং তারা মুখ গামছা দিয়ে ঢাকা অবস্থায় ছিল। এসময় ডাকাতরা ব্যবসায়ীদের কাছে থাকা টাকার ব্যাগ দাবি করে। পরে নৌকার ভেতরে থাকা পাটের বস্তা কেটে খাকি রঙের একটি ব্যাগ থেকে ৩৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা লুট করে নেয়। এছাড়াও নগদ টাকা, মোবাইল ফোনসহ মোট ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার ৭০০ টাকার মালামাল লুট করা হয়।
মাঝির সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
এজাহারে উল্লেখ করা হয়, নৌকার মাঝি সজিব মিয়া ডাকাতদের সহযোগিতা করেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ডাকাতরা নৌকায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে মাঝি ইঞ্জিন বন্ধ করে দেয় এবং ডাকাতদের গতিবিধিতে সহযোগিতা করে বলে অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর ভৈরব নৌ-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে মাঝি সজিব মিয়াকে আটক করে। পরে তার বিরুদ্ধে ডাকাতি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়। এসময় ডাকাতদের ফেলে যাওয়া একটি ডিজেলচালিত কুশা নৌকা, একটি ধারালো রামদা ও পাথরের খোয়া উদ্ধার করে পুলিশ।
রিমান্ড আবেদন
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) কাশী চন্দ্র শর্মা আদালতে দাখিল করা রিমান্ড আবেদনে উল্লেখ করেন, সংঘবদ্ধ ডাকাত দলের অন্যান্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার, লুণ্ঠিত ৩৫ লাখ ৭৯ হাজার ৭০০ টাকা উদ্ধার, ডাকাত দলের মূল পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের শনাক্ত এবং নদীপথে সংঘটিত অন্যান্য ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা যাচাইয়ের জন্য ধৃত আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রিমান্ড আবেদনে আরও বলা হয়, আসামিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, কললিস্ট, ডিজিটাল তথ্য ও যোগাযোগের মাধ্যম বিশ্লেষণ করে সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের নেটওয়ার্ক উদঘাটনের কাজ চলছে।
পুলিশের বক্তব্য
ভৈরব নৌ থানার পরিদর্শক কেএম মনিরুজ্জামান জানান, “গত ১৪ মে মেঘনা নদীতে সংঘটিত ডাকাতির ঘটনায় গ্রেফতারকৃত দ্বীন ইসলাম দীরা একজন চিহ্নিত ডাকাত এবং একাধিক মামলার আসামি। তাকে গ্রেফতারের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। পলাতক অন্যান্য ডাকাতদের গ্রেফতার ও লুণ্ঠিত টাকা উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
তিনি আরও জানান, নদীপথে সংঘবদ্ধ ডাকাতি দমনে নৌ-পুলিশের নজরদারি ও বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।