শাহিন আলম আশিক
বিশেষ প্রতিনিধি, অপরাধ জগত
বিশ্ব কূটনীতির ইতিহাসে ১০ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখটি সম্ভবত একটি কালো দিন হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। যখন পাকিস্তান, আমেরিকা ও ইরানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের এক সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির ঘোষণায় দীর্ঘ সংঘাতক্লান্ত পৃথিবী এক পাক্ষিক স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল, তখন সেই প্রশান্তির আয়ু ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। শান্তির সেই পবিত্র প্রতিশ্রুতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে লেবাননের জনপদে ইসরায়েলি খুনি বিমান থেকে নেমে এল বারুদের পৈশাচিক উৎসব। এই হামলা কেবল একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক শিষ্টাচারের মুখে এক চরম চপেটাঘাত এবং একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের ওপর নগ্ন আস্ফালন।
‘অপারেশন ইটারনাল ডার্কনেস’: এক পরিকল্পিত গণহত্যা
তথাকথিত ‘অপারেশন ইটারনাল ডার্কনেস’-এর নামে বৈরুতসহ লেবাননের প্রধান শহরগুলোতে যে ধ্বংসলীলা চালানো হয়েছে, তাকে কোনো সামরিক পরিভাষা দিয়ে আড়াল করা সম্ভব নয়। এটি ছিল স্রেফ একটি পরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস। মাত্র কয়েক মিনিটের ঝোড়ো হামলায় ৩০০-এর বেশি নিরপরাধ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।
শান্তির প্রস্তাব যখন আলোচনার টেবিলে, তখন বেসামরিক জনগণের ওপর এই নির্বিচার বোমা বর্ষণ প্রমাণ করে যে, ইসরায়েল কোনো আন্তর্জাতিক আইন, জেনেভা কনভেনশন বা দ্বিপাক্ষিক চুক্তির তোয়াক্কা করে না। এটি কেবল আগ্রাসন নয়, বরং কাপুরুষোচিত এক গণহত্যামূলক উন্মাদনা। জনাকীর্ণ এলাকাগুলোকে লক্ষ্য করে যেভাবে বাঙ্কার-বাস্টার বোমা ব্যবহার করা হয়েছে, তা বিশ্ববিবেককে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
মধ্যস্থতার অবমাননা ও বৈশ্বিক নীরবতা
এই হামলার টাইমিং বা সময় নির্বাচন অত্যন্ত সুচিন্তিত। যখন মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো একটি টেকসই শান্তির পথে হাঁটছিল, ঠিক তখনই ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর নির্দেশে এই হামলা চালানো হয়। এটি বিশ্বনেতৃত্বের সামর্থ্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল। আমেরিকা ও ইরানের সমঝোতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ইসরায়েল মূলত বার্তা দিতে চেয়েছে যে, তারা কোনো শান্তিপূর্ণ সমাধানে বিশ্বাসী নয়।
আর কতকাল ‘আত্মরক্ষার’ ঠুনকো দোহাই দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রকে রক্তে রঞ্জিত করা হবে? আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখের সামনে একটি যুদ্ধবিরতির ঘোষণাকে এভাবে নস্যাৎ করার সাহস তারা পায় কোত্থেকে? তথাকথিত শক্তিশালী দেশগুলোর রহস্যময় নীরবতা এবং ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার আজ এই আগ্রাসনকে আরও উসকে দিচ্ছে। জাতিসংঘ কি তবে কেবলই একটি তাত্ত্বিক সংস্থায় পরিণত হয়েছে?
আমাদের দাবি ও বিশ্ববিবেকের কাছে প্রশ্ন
আমরা স্পষ্ট ভাষায় বলতে চাই:
•অবিলম্ব জবাবদিহিতা: অবিলম্বে এই পৈশাচিক আগ্রাসন ও নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে হবে। যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী এই হায়েনাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
•সার্বভৌমত্ব রক্ষা: লেবাননের মাটি থেকে প্রতিটি দখলদার পদচিহ্ন মুছে ফেলে সেখানে স্থায়ী শান্তি ও সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
•মানবিক করিডোর: অবরুদ্ধ এলাকাগুলোতে অনতিবিলম্বে পর্যাপ্ত চিকিৎসা ও ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বজ্রকণ্ঠের প্রতিবাদ: লেবানন একা নয়
আমরা এই জঘন্য ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক হামলার বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। লেবাননের মানুষের আর্তনাদ আজ আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করছে। আমরা বিশ্ববাসীকে জেগে ওঠার আহ্বান জানাই। মনে রাখবেন, আজকের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপনার নীরবতা আগামীকালের আরও বড় কোনো বিপর্যয়ের পথ প্রশস্ত করছে। আজকের বৈরুত যদি নরকে পরিণত হয়, তবে এর আঁচ থেকে বাকি বিশ্বও নিরাপদ থাকবে না।
ইসরায়েলের এই অমানবিক দাম্ভিকতা আর বরদাশত করা হবে না। লেবানন একা নয়; শান্তিকামী বিশ্ব আজ তাদের পাশে দাঁড়িয়ে এই জুলুমের অবসান চায়। ইতিহাসের পাতায় বিশ্বাসঘাতকদের কোনো ক্ষমা নেই। মানবতার জয় নিশ্চিত করতে হলে আজ আমাদের সংহতির বিকল্প নেই।
বিজয় হোক মানবতার, শপথ হোক প্রতিরোধের!