রিপোর্ট: শামীম আহমেদ।
ভৈরবের শান্তশিষ্ট বাঁশগাড়ী গ্রামের আকাশ এখন কেবলই এক পিতার আর্তনাদে ভারী—
“আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন… তিনদিন ধরে কোনো খবর নেই আমার আদুরে হাবিবার!”
১৫ বছর বয়সী মাদ্রাসাছাত্রী হাবিবা আক্তার, বাঁশগাড়ী আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। ৫ নভেম্বর সকাল ৯টার দিকে মাদ্রাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হয় সে, কিন্তু আর ফিরে আসেনি।
তিন দিন কেটে গেছে— মাদ্রাসা, আত্মীয়স্বজন, এমনকি পাশের গ্রামগুলো খুঁজেও তার কোনো সন্ধান মিলছে না।
পরিবারের দাবি, একই এলাকার কয়েকজন যুবক পূর্বপরিকল্পিতভাবে হাবিবাকে অপহরণ করেছে।
এ ঘটনায় নিখোঁজের দিনই ভৈরব থানায় জিডি (নং ২৭৩, তারিখ: ০৬/১১/২০২৫) এবং পরবর্তীতে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন মেয়ের বাবা রমজান আলী।
ঘটনার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিরস্ত্র) মোঃ ফরিদুজ্জামান, যিনি নিজেই এলাকার মানুষদের সাথে কথা বলছেন, মাঠে কাজ করছেন দিনরাত।
তিনি বলেন—
“ঘটনাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। মেয়েটি অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং মাদ্রাসা পড়ুয়া হওয়ায় আমরা এটিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তদন্ত করছি।
আমরা ইতিমধ্যে অভিযুক্তদের কয়েকজন আত্মীয় ও ঘনিষ্ঠজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রযুক্তির সহায়তায় হাবিবার অবস্থান শনাক্তে চেষ্টা অব্যাহত আছে। আশা করছি দ্রুতই তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
ভৈরব থানার অফিসার ইনচার্জ খন্দকার ফুয়াদ রূহানী বলেন—
“একজন কিশোরী নিখোঁজ মানে একটি পরিবারের হৃদয়ে ছুরির আঘাতের মতো ব্যথা।
আমরা হাবিবার পরিবারের সাথে আছি— আইনগত ও মানবিক উভয় দিক থেকেই।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত জোরদার করা হয়েছে, এবং আশা করছি অচিরেই সুখবর দিতে পারব।”
নিখোঁজ হাবিবার বাবা রমজান আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন—
“তিন দিন হলো আমার আদরের মেয়ে নেই।
ও সকালে পড়তে যায়, বিকেলে হাসতে হাসতে ফিরে আসে— এখন সেই হাসিটাই হারিয়ে গেছে।
আমার মেয়েটা কারও ক্ষতি করেনি, শুধু কিছু অসাধু ছেলেদের প্রস্তাবে না বলেছে।
আমি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হাতজোড় করে বলি— আমার মেয়েকে ফিরিয়ে দিন, ওর মা আর আমি দিনরাত এক করে বসে আছি দরজায়।”
নিখোঁজ হাবিবার দুলাভাই দুলাল মিয়া কান্না চেপে বলেন—
“ও আমার চোখের সামনে বড় হয়েছে। ওর হাসি ছিল আমাদের ঘরের প্রাণ।
এখন ঘরে কেবল নীরবতা। বড় ভাইয়ের বাচ্চারা পর্যন্ত জিজ্ঞাসা করে— ‘হাবিবা আপু কই?’ আমি কিছুই বলতে পারি না।
আমরা শুধু চাই, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন আমাদের এই অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরায়।”
বাঁশগাড়ী আলীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আব্দুল কাদের বলেন—
“হাবিবা আমাদের অন্যতম ভালো ছাত্রী।
সে নিয়মিত নামাজ পড়তো, সময়মতো ক্লাস করতো এবং অন্য ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে খুব ভদ্রভাবে চলতো।
ওর মতো একটি মেয়ের নিখোঁজ হওয়া আমাদের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীকে মানসিকভাবে আঘাত করেছে।
আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করছি, হাবিবা যেন নিরাপদে ফিরে আসে।”
নিখোঁজ হাবিবার সহপাঠী মাহমুদা আক্তার অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলে—
“ও প্রতিদিন ক্লাসে আগে আসতো, আমাদের নোট বানিয়ে দিত, পরীক্ষার আগে সবাইকে উৎসাহ দিত।
তিন দিন ধরে ওর খালি বেঞ্চের দিকে তাকিয়ে থাকতে আর ভালো লাগে না।
আমরা সবাই ওর জন্য দোয়া করছি— যেন খুব দ্রুত ফিরে আসে।”
তিন দিন পেরিয়ে গেছে— কিন্তু বাঁশগাড়ীর বাতাসে এখনো ভাসছে এক পিতার ডাক, এক সমাজের বিবেকের প্রশ্ন:
“কোথায় আমার হাবিবা?”
ভৈরব থানা পুলিশ বলছে— “আমরা আশাবাদী, হাবিবা নিরাপদে ফিরে আসবে।”
আর আমরা সবাই সেই আশাতেই প্রার্থনা করি—
হাবিবা, ফিরে এসো… তোমার মা-বাবার বুকের ভরসা হয়ে আবার হাসো।