নিজস্ব প্রতিবেদক, নরসিংদী
নরসিংদীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া একসময়ের প্রমত্তা নদীগুলো আজ শিল্পায়নের বলি হয়ে বিষাক্ত ড্রেনে পরিণত হয়েছে। মেঘনা, শীতলক্ষ্যা, ব্রহ্মপুত্র, আড়িয়াল খাঁ, হাঁড়িধোয়া ও পাহাড়িয়া—জেলার প্রতিটি নদীই আজ অস্তিত্ব সংকটে। কলকারখানার অপরিশোধিত রাসায়নিক বর্জ্য অবাধে নদীতে ফেলার ফলে পানি এখন প্রাণঘাতী বিষে রূপ নিয়েছে। বিপন্ন হচ্ছে জলজ প্রাণি, ধ্বংস হচ্ছে কৃষি, আর দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছে লাখ লাখ মানুষ।
বর্জ্যের ভাগাড় যখন নদী
সরেজমিনে তদন্তে দেখা গেছে, মাধবদী, শেখেরচর ও পলাশ এলাকার ডাইং এবং ব্যাটারি কারখানাগুলো নদী দূষণের মূল হোতা। স্থানীয়দের অভিযোগ মতে— মাধবদী ডাইং, কালিবাড়ী, ব্রাইট, তিথি, বিসমিল্লাহ, ফাতেমা, অর্ক, ফাইভ ফাইভ, রাতুল, তালহা, নূরজাহান, আদুরী, সংগীতা, ঈগল ও শিল্পী ডাইং এবং পলাশের সামরী, জনতা জুট ও প্রাণ আরএফএল-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রতিদিন পাইপের মাধ্যমে সরাসরি বিষাক্ত তরল বর্জ্য নদীতে নির্গত হচ্ছে।
সম্প্রতি আকিজ (জনতা জুট) মিলের এসিড মিশ্রিত পানিতে প্রায় ২ কোটি টাকার মাছ মরে ভেসে ওঠার ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একসময়ের রূপালি ইলিশ, বোয়াল, রুই, কাতলা ও পাঙ্গাশের চারণভূমি এখন মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
গবেষণা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি
রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টার-এর তথ্যমতে, হাঁড়িধোয়া ও শীতলক্ষ্যা নদী এখন দেশের অন্যতম দূষিত নদী। পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের (DO) মাত্রা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় জলজ প্রাণির বেঁচে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে:
দূষিত পানির সংস্পর্শে চর্মরোগ ও ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষিজমিতে এই পানি ব্যবহারের ফলে ফলন বিপর্যয় ঘটছে।
গবাদিপশু ও পাখির জীবনহানি ঘটছে।
পানির তীব্র দুর্গন্ধে তীরের জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও দুর্নীতির অভিযোগ
নদী রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসন মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও তা কার্যত “লোক দেখানো” বলে দাবি স্থানীয়দের। সম্প্রতি ১১টি কারখানা সিলগালা করা হলেও আড়ালে চলছে ভয়াবহ অনিয়ম। অভিযোগ উঠেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের জনৈক কর্মকর্তা কারখানাগুলো থেকে নিয়মিত মোটা অংকের ‘মাসোহারা’ আদায় করেন। টাকা না দিলে ঢাকার কর্মকর্তাদের এনে হয়রানি ও কারখানা বন্ধের ভয় দেখানো হয়।
এ বিষয়ে নরসিংদী পরিবেশ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বদরুল হুদা জনবল সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, “আমরা কাজ করছি। কেউ ঘুষ চাইলে তাকে বেঁধে রেখে আমাকে খবর দিন। আমি পরিবেশ দূষণ হতে দেব না।”
সংসদ সদস্যের ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা
সম্প্রতি নরসিংদী সদর আইনশৃঙ্খলা সভায় স্থানীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকন পরিবেশ অধিদপ্তরের ব্যর্থতায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি সরাসরি বলেন, “পরিবেশ অধিদপ্তর ঠিকমতো কাজ করছে না বলেই নদী-নালা ও খাল-বিল আজ ধ্বংসের মুখে। নরসিংদীর ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করতে পরিবেশ দূষণের বিরুদ্ধে আমার নীতি ‘জিরো টলারেন্স’। কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
সচেতন মহলের দাবি
নরসিংদী পরিবেশ আন্দোলনের নেতারা অবিলম্বে চারটি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন:
১. কারখানাগুলোতে কার্যকর ETP (Effluent Treatment Plant) নিশ্চিত করা।
২. দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল ও জরিমানা।
৩. নদী তীরের অবৈধ দখল উচ্ছেদ ও নিয়মিত মনিটরিং।
৪. পরিবেশ অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতির নিরপেক্ষ তদন্ত।
সময় থাকতে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে নরসিংদীর এই প্রাকৃতিক সম্পদ অচিরেই ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাবে, যার দায় নিতে হবে বর্তমান প্রজন্মকেই।