বিশেষ প্রতিনিধি :
দানবীর ও কর্মবীর এস এম এ আহাদ যশোর ও নড়াইল অঞ্চলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও সমাজসেবায় এক অবিস্মরণীয় পথপ্রদর্শক।
শিল্পপতি এস এম এ আহাদ ছিলেন একাধারে সফল ব্যবসায়ী, সমাজসেবক, আর্তমানবতার সেবক এবং নিবেদিতপ্রাণ ক্রীড়া সংগঠক। সারা জীবন যশোর ও নড়াইলের মানুষের কল্যাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে তিনি নীরবে-নিভৃতে কাজ করে গেছেন।
সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্তান্ত
জন্ম: ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দ, লাহুড়িয়া গ্রাম, লোহাগড়া (তৎকালীন যশোর, বর্তমান নড়াইল জেলা)।
পিতা: মৌলবী সামাদ।
মাতা: সাকা হোসেন (গ্রাম: রাতইল, গোপালগঞ্জ)।
পরিবার: তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। ১৯৫২ সালে ঝিনাইদহের নারকেলবাড়িয়ায় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন (সহধর্মিণী: আমেনা খাতুন)। তিনি ৫ সন্তানের জনক।
শিক্ষা ও কর্মজীবন: ম্যাট্রিক পাস। কর্মজীবনে তৈরি পোশাক, আবাসন খাত এবং আহাদ জুট মিলসহ বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন।
স্থায়ী নিবাস: গুরুদাস বাবু রোড, যশোর।
প্রয়াণ: ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দ।
সমাজসেবায় সহযোদ্ধাগণ
তৎকালীন সময়ে তিনি শিব প্রসাদ আগস্তী, দামোদর মুর (মাড়োয়ারী), চিত্তরঞ্জন সাহা, সুধির ঘোষ, পুটে সরদার, শামসুল হক, বজলুর রহমান, জয় গোপাল, রবি সরকার, রবি সাহা, পশুপতি বাবু ও ওয়াদূদ মিয়ার মতো প্রখ্যাত ব্যক্তিদের সঙ্গে যৌথভাবে নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
শিক্ষা বিস্তারে অনন্য অবদান
এস এম এ আহাদ ডিগ্রী কলেজ (১৯৯৪–১৯৯৫): নড়াইলের লোহাগড়ার লাহুড়িয়া ইউনিয়নে উচ্চশিক্ষার প্রসারে এটি প্রতিষ্ঠা করেন, যা এলাকার অন্যতম প্রধান শিক্ষাকেন্দ্র।
আমেনা খাতুন ডিগ্রী কলেজ: ঝিনাইদহের নারকেলবাড়িয়া গ্রামে নিজ ধর্মীয় সহধর্মিণীর নামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন।
আবদুস সামাদ মেমোরিয়াল একাডেমী: পিতার স্মৃতি রক্ষার্থে এই একাডেমী গড়ে তোলেন।
জামিয়া ফোরকানিয়া এতিমখানা ও মাদ্রাসা (১৯৯১): যশোর শহরের বকচরে ৫ বিঘা জমির ওপর এটি স্থাপন করেন।
স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসায় ভূমিকা
রেড ক্রিসেন্ট ও রক্তদান: ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট (যশোর ইউনিট)-এর ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন "আহাদ রেড ক্রিসেন্ট রক্তদান কেন্দ্র"।
পরিবার পরিকল্পনা ও ব্লাড ব্যাংক: ১৯৭৭ সাল থেকে বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি (যশোর শাখা)-র সভাপতি এবং ১৯৮৪ সাল থেকে ব্লাড ব্যাংকের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ডায়াবেটিক সমিতি: ১৯৯৪ সাল থেকে বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি (যশোর শাখা)-র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ১৯৯৬ সাল থেকে জাতীয় কাউন্সিলের (ঢাকা) সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
হাসপাতাল অবকাঠামো: যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৪০ বেডের গাইনি ওয়ার্ড নির্মাণ, আহাদ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি এবং আহাদ ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে যশোরের চিকিৎসা ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন।
ক্রীড়াঙ্গনে দিগন্তকারী ভূমিকা
যশোরের ক্রীড়াঙ্গন গঠনে তাঁর ভূমিকা অপরিসীম:
সংগঠক ও ক্লাব পরিচালনা: ১৯৫৭ সালে এ আর মল্লিকের সঙ্গে যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার কার্যনির্বাহী সদস্য হন। দীর্ঘদিন ইস্টার্ন ক্লাব-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এভারগ্রীন ক্লাব-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৩–১৯৭৫ মেয়াদে মোহামেডান ক্লাব-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
প্রতিযোগিতা ও প্রবর্তন: ১৯৬১ সালে যশোরে ক্রিকেট খেলা প্রসারে আর্থিক ও সাংগঠনিক মূল সহায়তা দেন। ১৯৬২ সালে রুহুল কুদ্দুস কাপ প্রবর্তনে ভূমিকা রাখেন এবং ১৯৬৬ সালে স্টেডিয়ামে জাতীয় প্রদর্শনীমূলক কুস্তি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন।
শামস উল হুদা গোল্ড কাপ: টুর্নামেন্টের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সহায়তা করে আসছেন এবং মূল গোল্ড কাপটি তাঁরই দানকৃত।
যশোর স্টেডিয়াম আধুনিকায়ন: নিজ সহধর্মিণীর স্মরণে যশোর স্টেডিয়ামে আন্তর্জাতিক মানের "আমেনা খাতুন ভিআইপি গ্যালারি", বিএমএ ভবনে "আমেনা খাতুন অডিটোরিয়াম" (ড্রেসিং রুম, প্রেস বক্স, ভিআইপি কনফারেন্স রুম ও ক্রিকেট গ্যালারিসহ) তৈরিতে সম্পূর্ণ অর্থায়ন করেন।
ধর্মীয় ও সামাজিক অবদান
কারবালা কবরস্থান ও ওয়াকফ এস্টেট: যশোর কারবালার "পীর নূর বোরহান শাহ ওয়াকফ এস্টেট"-এর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ১৯৭৬ সাল থেকে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেন। শহরের প্রধান কারবালা কবরস্থানে ৩৫ বিঘা জমি দান করেন এবং বাউন্ডারি প্রাচীর ও মসজিদ উন্নয়নে সরাসরি অংশ নেন।
মসজিদ ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা: অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া পীরবাড়ী সংলগ্ন দৃষ্টিনন্দন মসজিদ নির্মাণ করেন। এ ছাড়া অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা ও ওয়াকফ এস্টেটে তাঁর অবদান অতুলনীয়।
অন্যান্য সামাজিক দায়িত্ব: ১৯৮৮ থেকে "নাগরিক কল্যাণ সমিতি"-র সভাপতি, ১৯৮৩ থেকে "আঞ্জুমানে খালেেকিয়া"-র চেয়ারম্যান এবং ১৯৯৪ থেকে "ফুরফুরা মিশন" (যশোর)-এর সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
ঢাকার যশোর সমিতি: ঢাকাস্থ নীলক্ষেতে যশোর সমিতি ভবনে "এস এম এ আহাদ অডিটোরিয়াম" নির্মাণ করেন।
উপসংহার:
এস এম এ আহাদ কেবল একজন শিল্পপতিই ছিলেন না; তিনি ছিলেন যশোর ও নড়াইল অঞ্চলের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ক্রীড়া ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে তাঁর রেখে যাওয়া এই অসামান্য কীর্তি যশোরবাসী চিরকাল শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ রাখবে।